পদ্মা নদীর মিডিলচর। অথৈই পানিতে নিমজ্জিত চারপাশ। চরের বেশির ভাগ বাড়িতে কোমর পানি। যে বসতবাড়িগুলোতে পানি ওঠেনি সেগুলো চরের সমাতল থেকে চার-পাঁচ ফুট উঁচু। বাড়ির সামনে বাঁশের মাচায় বসে একে অপরের সাথে কথা বলছেন তাহাজান বিবি ও নুরুল ইসলাম দম্পতি। পদ্মার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। শেষ সম্বলটুকু তলিয়ে গেলে কোথায় যাব, কী করব— এমন চিন্তায় দিন কাটছে এই দম্পতির।
চরের কষ্টের জীবনের কথা জানাতে গিয়ে নুরুল ইসলাম বলেন, কয়েক বছর থেকে এই চরে পানি উঠেছে। আগে উঠত না। পানি উঠে ডুবে গেলেও কিছু করার নেই। কারণ চর ছাড়া আমাদের বাড়ি নেই। রাজশাহী শহরে ভাড়া থাকার মতো সামর্থ্য নেই। সবাই বলছে- আরও পানি বাড়বে। যদি চর ছাড়তেই হয়, ঘরে পানি ঢুকলে ছাড়বে।
তাহাজান বিবি বলেন, এই চরে সবাই চুলায় রান্না করে। সব ডুবে যাওয়ায় সেই জায়গা নেই। আমাদের গবাদি পশুগুলো শহরে (লোকালয়ে) পাঠিয়ে দিয়েছে। সেখানে অন্যদের গবাদি পশুর সঙ্গে রয়েছে। এই চরে অনেক কষ্ট করে জীবন-যাপন করতে হয়। এখন খাবার পানির খুব অভাব। সব টিউবওয়েলে বানের পানি ঢুকে গেছে। কোনরকম জীবন নিয়ে আছি।
চর খিদিরপুরের এই মিডিলচরে ১৫০ পরিবারের বসবাস। এই চর মিনি সুইজারল্যান্ড হিসেবেও অনেকের কাছে পরিচিত। পদ্মার পানি বাড়ার কারণে এই চরের অধিকাংশ ঘর-বাড়িতে পানি উঠেছে। তাতে করে থাকার জায়গা নেই। এমন পরিস্থিতিতে হাতেগুনা কয়েকটি পরিবার ছাড়া সবাই চর ছেড়েছে। যারা চর ছাড়েনি সেই পরিবারগুলোর সঙ্গে রয়েছে কুকুর-বিড়ালেরা। তাদের অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটছে।
বর্তমানে রাজশাহীর বড়কুঠি পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি প্রবাহিত হচ্ছে। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টায় পানি ছিল ১৭ দশমিক ৩০ সেন্টিমিটার। যা বিপৎসীমার শূন্য দশমিক ৭৫ সেন্টিমিটার নিচে। এর আগে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টায় রেকর্ড করা হয়েছে ১৭ দশমিক ২০ মিটার পানি। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় পদ্মার পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ১৫ মিটার। ২৪ ঘণ্টায় পদ্মার পানি বেড়েছে শূন্য দশমিক ১১ সেন্টিমিটার। পানি বাড়তে থাকায় পদ্মা নদীর মিডিল চরখিদিরপুর, খানপুরসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলে বন্যার পানি ঢুকেছে। অনেক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ চর ছাড়া হয়েছে। আর যারা আছে তারা বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের কষ্টে রয়েছে।
রাজশাহী পানি উন্নয় বোর্ডের গেট রিডার এনামুল হক বলেন, শুক্রবার (১১ সেপ্টম্বর) সন্ধ্যা ৬টায় রাজশাহীর বড়কুঠি পয়েন্টে পদ্মার পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ২৬ মিটার। যা বিপৎসীমার শূন্য দশমিক ৭৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
৫৫ বছর বসয়ী আসাবুদ্দিন বসবাস করেন চরখিদিরপুরে। এই চরে তিনি সাত বছর ধরে বসবাস করছেন। তিনি বলেন, আগে খিদিরপুর বিএসএফ ক্যাম্পের পাশে বাংলাদেশের সীমান্তে বাড়ি ছিল। সেই চরের বয়স ৫৬ বছর। সেখানে ২৫ বছরের বেশি সময় বসবাস করেছি। সেই চর ভেঙে যাওয়ার পরে তালাইমারী বিজিবি ক্যাম্পের পাশে নদীর চরে বসবাস করেছি। এরপর সাত বছর মিডিল চরে বসবাস করছি।