প্রকাশনার ১০ বছর

‘শিবিরের স্পাই’ সন্দেহে শিক্ষার্থীকে হেনস্তার অভিযোগ ছাত্রদলের বিরুদ্ধে

দৈনিক জনপদ
প্রকাশিত 16 September, Wednesday, 2026 02:31:47
‘শিবিরের স্পাই’ সন্দেহে শিক্ষার্থীকে হেনস্তার অভিযোগ ছাত্রদলের বিরুদ্ধে

ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শহীদ শামসুজ্জোহা হলের এক শিক্ষার্থীকে রাতভর হেনস্তা ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, তার মোবাইল ফোন চেক করে শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ খোঁজা হয় এবং তাকে ‘শিবিরের স্পাই’ আখ্যা দিয়ে রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ, হেনস্তা ও মারধর করা হয়।

ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থীকে গভীর রাতে হলের প্রভোস্টের কক্ষে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ এবং পুলিশের কাছে সোপর্দ করার চেষ্টারও অভিযোগ উঠেছে। গতকাল সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে জোহা হলে এ ঘটনা ঘটে।

ভুক্তভোগী মোহাম্মদ আসিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।

তিনি বলেন, আমার পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। এ কারণে হলে একটি সিটের জন্য প্রভোস্ট স্যারের কাছে কয়েকবার অনুরোধ করেছি। পরে গণরুমে ফাঁকা সিটের বিষয়ে জানতে গেলে আমাকে ছাত্রদলের হল সভাপতি ফুয়াদ ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। তার সঙ্গে কথা বললে তিনি ছাত্রদল করতে হবে এবং ছাত্রদল করলেই সিট দেওয়া হবে বলে জানান। পরিবারের পরিস্থিতির কারণে আমিও সিটের আশায় ছাত্রদলের সঙ্গে প্রোগ্রাম করার বিষয়ে রাজি হই।

তিনি বলেন, পরে রাতে তার কক্ষে গেলে একটি গ্রুপে যুক্ত করে দেওয়ার কথা বলে তিনি আমার মোবাইল ফোন নেন। এরপর ফোনের বিভিন্ন বিষয় চেক করে আমাকে শিবির করার এবং ‘শিবিরের স্পাই’ হিসেবে হলে আসার অভিযোগ করেন। আমি বিষয়টি অস্বীকার করে সিটের ব্যবস্থা করে দেওয়ার অনুরোধ করি। একপর্যায়ে তিনি আমাকে ধমক দেন এবং পরে ছাত্রদলের আরও কয়েকজন নেতাকর্মী সেখানে আসেন। তারা আমাকে টেনে গণরুমে নিয়ে যান এবং সেখানে আমার ওপর হাত তোলা ও মারধর করা হয়। জোহা হলের সেক্রেটারি সবুজ আহমেদও সেখানে ছিলেন এবং তিনিও আমাকে মারধর করেন।

আসিফ অভিযোগ করে বলেন, মারধরের পরও আমাকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং বারবার বলা হয়, আমি নাকি শিবিরের স্পাই হিসেবে সেখানে এসেছি। আমাকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি মেরে ফেললেও কেউ কিছু করতে পারবে না এবং পুকুরে ফেলে দেওয়ার মতো কথাও বলা হয়। ছাত্রলীগের সময় কী হয়েছে, সেসব উদাহরণ দিয়েও আমাকে ভয় দেখানো হয়। এসব ঘটনায় আমি এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ি যে প্রভোস্ট স্যারের সামনে থাকলেও কিছু বলতে পারিনি।

তিনি আরও বলেন, পরে আমার মোবাইল ফোন ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের ভিডিও ধারণ করা হয়। আমার কাছ দিয়ে বিভিন্ন কথা বলিয়ে ভিডিও করা হয়। এমনকি আমাকে দিয়ে লিখিয়েও নেওয়া হয় যে আমি নাকি নেতা হতে চাই। এভাবে আমার কাছ থেকে একটি স্বাক্ষরও নেওয়া হয়েছে।

আসিফ বলেন, আমি এখন খুবই আতঙ্কের মধ্যে আছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তা কখনো ভাবিনি। আমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ, আমার বিভাগ ও শিক্ষকদের কাছে সহযোগিতা চাই। আমার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং আমি যেন নিরাপদে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারি।

অভিযোগের বিষয়ে জোহা হল ছাত্রদল সভাপতি মেহেদী হাসান ফুয়াদ বলেন, প্রথমত, ওই শিক্ষার্থীকে আমি আগে থেকে সেভাবে চিনতাম না। রাকসু নির্বাচনের সময় সর্বোচ্চ এক-দুবার তার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। তিন দিন আগে প্রভোস্টের রুমের সামনে তার সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি আমাকে জানান, তিনি প্রায় তিন মাস ধরে অবৈধভাবে হলে ছিলেন এবং তার সিটটি নতুন করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখন তার থাকার জায়গা নেই, তিনি কী করবেন, এ বিষয়ে জানতে চান। আমি তাকে প্রভোস্ট স্যারের সঙ্গে কথা বলতে বলি।

তিনি বলেন, এ সময় তিনি আমাকে বলেন, তার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড বিএনপির এবং তাকে ছাত্রদলে নেওয়া হলে তিনি ছাত্রদল করবেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, ছাত্রদলে যোগ দিলেই যে সিট পাওয়া যাবে—এ কথা তাকে কে বলেছে? তখন তিনি চুপ হয়ে যান। আমি তাকে আরও বলি, তুমি তিন মাস ধরে অবৈধভাবে হলে ছিলে, তখন তো আমাদের কিছু বলোনি। তোমাকে অবৈধভাবে হলে রাখল কে? তখন সে জানায়, বিষয়টি সে এভাবে জানতো না। কিন্তু তার ফোনের বিভিন্ন তথ্য ও নথি দেখে আমার কাছে মনে হয়েছে, শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই তাকে ওই রুমে তিন মাস অবৈধভাবে রেখেছিল।

ফুয়াদ আরও বলেন, এরপর সে আমাকে তার বিষয়টি দেখার অনুরোধ করে। গতকাল সন্ধ্যার দিকে সে আবার আমাকে ফোন করে দেখা করতে চায়। আমি তখন বাইরে ছিলাম। রাত ১১টার দিকে তাকে আমার রুমে আসতে বলি। সে রুমে আসার পর আমি তার নিজের ফোনে ভিডিও ধারণ করি। সেখানে আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, তুমি যেহেতু ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত হতে চাচ্ছ, কিন্তু ডাকসু নির্বাচনে শিবিরের সঙ্গেও তোমার যোগাযোগ ছিল। তুমি আমাদের সঙ্গে যোগ দিলে পরবর্তীতে শিবিরের সঙ্গে কোনো সমস্যা হবে কি না। তখন সে শিবিরের সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে এবং তার পরিবারের সবাই বিএনপির সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করে।

তিনি বলেন, এরপর তাকে আমাদের হলের ছাত্রদলের গ্রুপে যুক্ত করার জন্য তার ফোন হাতে নিই। তখন তার ফোনে হল শিবিরের সভাপতি রাফসানের সঙ্গে কথোপকথন দেখতে পাই। ওই কথোপকথনে দেখা যায়, তাদের দীর্ঘদিনের পরিচয় রয়েছে এবং বিভিন্ন বিষয়ে যোগাযোগ হয়েছে। সেখানে রাফসান তাকে আমার সঙ্গে কথা বলার সময় রেকর্ড চালু রাখতে এবং প্রভোস্টের রুমে যাওয়ার আগে ও ভেতরে কথাবার্তা রেকর্ড করে তাদের দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে—এমন তথ্যও আমি দেখতে পাই। হলের সেকশন অফিসারের রুমে গিয়েও নজরদারি করার বিষয়ে তার ফোনে তথ্য পাওয়া যায়।

ফুয়াদ বলেন, এসব তথ্য থেকে আমার মনে হয়েছে, ওই শিক্ষার্থীকে ব্যবহার করে ছাত্রদলকে বিতর্কিত বা কলঙ্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমার ধারণা, শিবির তাকে একটি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জোহা হলে ছাত্রদলের সভাপতির বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে।

মারধরের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আরেকটি ভিডিও বার্তায় আমি তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছি, আমরা কি তোমাকে কোনো ধরনের মারধর করেছি? সে সেখানে স্পষ্টভাবে বলেছে, না, আমি কোনো মারধর করিনি। বরং সে আমার পা ধরে ক্ষমা চেয়েছে এবং বলেছে, সে ভুল করেছে, এমনটা করা তার উচিত হয়নি। সে আমাকে এই যাত্রায় ক্ষমা করে দিতে অনুরোধ করেছে এবং পরবর্তীতে আমাদের সঙ্গে থাকার কথাও জানিয়েছে।

এ বিষয়ে রাবি ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, ওই ছেলে যখন হল সভাপতির রুমে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে, তখন হল ছাত্রদলের সভাপতি আমাকে ফোন করে জানতে চান, এখন কী করা উচিত। আমি তাকে স্পষ্টভাবে নির্দেশনা দিই, কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেন না ঘটে। যত রাতই হোক, তাকে হল প্রভোস্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। আমি পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিই, অন্যায়ের বিচার করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের, তোমাদের নয়। কোনো ধরনের হয়রানি বা অপ্রীতিকর আচরণ ছাড়াই তাকে হল প্রশাসনের মাধ্যমে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করাই হবে দায়িত্বশীল আচরণের পরিচয়। আর তারা সেটাই করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, যে ঘটনাটি ঘটেছে সেটা নিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সাথে বসে আলোচনা করেছে। প্রকৃত ঘটনা জেনে পরে জানাতে পারবো।

এদিকে এ ঘটনায় প্রশাসনের কাছে হলের প্রভোস্টের পদত্যাগসহ ৪ দফা দাবি জানিয়েছে ছাত্রশিবির। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের কনফারেন্স রুমে প্রশাসনের সঙ্গে এক বৈঠকে দাবিগুলো জানায় রাবি ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল।

৪ দফা দাবিগুলো হলো- অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা যিনি অনৈতিকভাবে হলে থাকছেন এবং নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত তাকে হল থেকে বের করতে হবে, সে যে ফৌজদারি অপরাধ করেছে সেজন্য তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে, যে শিক্ষার্থীকে হেনস্থা করা হয়েছে, তার পরিবারের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের ব্যবস্থা করতে হবে, তিনি মানসিকভাবে ট্রমায় আছেন কি না, সেজন্য তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে এবং তার ফোন বাজেয়াপ্ত করে যে ফৌজদারি অপরাধ করা হয়েছে, সেজন্য হল প্রভোস্টকে অব্যাহতি দিতে হবে।

এ সময় রাবি ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল বলেন, ২৪-পূর্ববর্তী সময়ে শিবির ট্যাগ দিয়ে যতজনকে মারা হয়েছে, তাদের অধিকাংশই ছিল সাধারণ শিক্ষার্থী। এখানেও সেরকম ট্যাগিংয়ের চেষ্টা করা হয়েছে। হলের রুমে তাকে টর্চার করা হয়েছে। আমার মনে হয়, বঙ্গবন্ধু হলে যেভাবে ছাত্রলীগের নেতারা টর্চার করতেন, সেভাবেই আবার টর্চার সেল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ সুষ্ঠু-স্বাভাবিক থাকবে কি না, সেই নিশ্চয়তা প্রশাসনকে নিশ্চিত করতে হবে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুনুর রশীদ বলেন, আমরা দাবিগুলো শুনেছি। প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে এর বিরুদ্ধে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নেব।