নিজস্ব প্রতিবেদক :
রাজধানীতে সাবেক এক প্রভাবশালী ছাত্রনেতাকে না পেয়ে তাঁর বাসভবনে ঢুকে পরিবারের সদস্যদের ওপর বর্বরোচিত সশস্ত্র হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। হামলায় ওই নেতার বৃদ্ধ বাবাকে বেধড়ক মারধর করা হয় এবং শ্বশুরকে বাঁচাতে গিয়ে ধারালো অস্ত্রের সরাসরি ছুরিকাঘাতে গুরুতর রক্তাক্ত জখম হয়ে চিকিৎসাধীন ওই নেতার স্ত্রী।
০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ বিকেলে রাজধানীর শ্যামপুর থানাধীন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ঢাকা-৪ আসন, ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডের ফরিদাবাদ এলাকার সি/৫ ইস্টার্ন হাউজিংয়ে এই হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার লক্ষ্য মোঃ জাহিদ হাসান মুন্না, তিনি স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ আব্দুল মালেকের ছেলে এবং সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও শ্যামপুর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ০৯ সেপ্টেম্বর বিকেলে সাবেক ছাত্রনেতা মোঃ জাহিদ হাসান মুন্নাকে খুজতে স্থানীয় বিরোধী রাজনৈতিক দলের ১০-১২ জনের একটি সংঘবদ্ধ সশস্ত্র দল তাঁর বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা বাসায় ঢুকে মুন্নাকে খুঁজতে থাকে। তবে মুন্না বাসায় না থাকায় সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁর বৃদ্ধ বাবা মোঃ আব্দুল মালেকের ওপর চড়াও হয়। হামলাকারীরা তাঁকে বেধড়ক মারধর ও চরম অপমান-অপদস্ত করতে থাকে। একপর্যায়ে তারা বৃদ্ধ বাবাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাতের চেষ্টা করলে মুন্নার স্ত্রী কানিজ ফাতেমা সাদিয়া নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শ্বশুরকে রক্ষা করতে এগিয়ে যান। তখন হামলাকারীরা সাদিয়ার পেটে সরাসরি ছুরিকাঘাত করে মারাত্মক রক্তাক্ত জখম করে। এখন তিনি চিকিৎসাধীন আছেন বলে জানা যায়।
স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্র ও প্রতিপক্ষের অভিযোগ থেকে হামলার কারণ হিসেবে জানা যায়, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মুন্না বিগত সরকারের সময়ে এলাকায় রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন। সরকারবিরোধীদের দাবি—ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তিনি স্থানীয় বিরোধী নেতাকর্মীদের রাজনৈতিকভাবে দমন-পীড়ন এবং পুলিশি তৎপরতায় প্রভাব বিস্তার করতেন। এছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনেও সরকারের সমর্থনে তিনি মাঠপর্যায়ে কঠোর অবস্থানে ছিলেন বলে প্রতিপক্ষ দলগুলো অভিযোগ তোলে। মূলত দীর্ঘদিনের এই পুঞ্জীভূত রাজনৈতিক ক্ষোভ এবং ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটই তাঁর বাসভবন ও পরিবারের ওপর এই বর্বরোচিত হামলা ও প্রাণনাশের চেষ্টা চালানো হয়।
স্থানীয়দের আরও দাবি, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের শুরুতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় শ্যামপুর, পোস্তগোলা, জুরাইন ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ ও মিছিলকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দফায় সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা ঘটে। তাঁদের অভিযোগ, এসব ঘটনায় তৎকালীন পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। হামলার সময় টিয়ারশেল, রাবার বুলেট এবং গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটে বলে তাঁরা দাবি করেন। এতে বহু শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ আহত হন এবং কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে বলে স্থানীয়দের বক্তব্য।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ঘটনার সময় শ্যামপুর থানা ছাত্রলীগের নেতৃত্বের মধ্যে মো. জাহিদ হাসান মুন্নার নামও উঠে আসে। তাঁদের দাবি, তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রভাব ও সমর্থনের মধ্যেই স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিলেন। এসব অভিযোগের কারণেই সরকার পতনের পর মুন্নাকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে ক্ষোভ ও বিরোধিতা আরও তীব্র হয় এবং তাঁকে খুঁজতে বিভিন্ন পক্ষ সক্রিয় হয়ে ওঠে বলে স্থানীয়রা জানান।
এদিকে ৫ আগস্ট ২০২৪ দুপুরের দিকে শেখ হাসিনা ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার পরপরই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দেয়। ওই সময় বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা ও থানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। শ্যামপুর থানাতেও হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সেসময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় বিভিন্ন থানায় সংরক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ ও গোপনীয় নথিপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে ৬ আগস্ট রিজু নামে এক ছাত্রলীগ কর্মী নথিপত্র সরিয়ে নেওয়ার কাজে যুক্ত ছিলেন। পরে তিনি স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে আটক হন এবং তাঁদের হামলায় নিহত হন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
রিজুর মৃত্যুর পর এলাকায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। একই সময়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও বিক্ষুব্ধ জনতার খোঁজাখুঁজির আশঙ্কায় মো. জাহিদ হাসান মুন্না আত্মগোপনে আছেন বলে জানা যায়।
এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার ওপর হামলার অভিযোগে রাজধানীর শ্যামপুর, যাত্রাবাড়ীসহ আশপাশের থানাগুলোতে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দায়ের করা এসব মামলার বেশ কয়েকটিতে শ্যামপুর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মোঃ জাহিদ হাসান মুন্না এবং বর্তমান সভাপতি রনি আলমকেও এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছে। মামলার পর থেকেই জাহিদ হাসান মুন্না আত্মগোপনে রয়েছেন, তবে তাঁর সহযোগী রনি আলম ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
মামলা ও তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, যেসব মামলা দায়ের হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চলছে।
এজাহারভুক্ত আসামিদের প্রাথমিক সংশ্লিষ্টতা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। স্থানীয় সাবেক ছাত্রনেতা জাহিদ হাসান মুন্নাসহ যাদের নাম এজাহারে এসেছে, তাদের প্রত্যেকের ভূমিকা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “মামলার পর থেকেই বেশ কয়েকজন এজাহারনামীয় আসামি পলাতক থাকা আইনি প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে না। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যু করা হয়েছে এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।