প্রকাশনার ১০ বছর

[english_date]

আমীনূর রশীদ চৌধূরী : সংগ্রাম, স্বদেশ ও সিলেট চেতনার এক অনন্য অভিযাত্রী

দৈনিক জনপদ
প্রকাশিত 30 August, Sunday, 2026 20:36:34
আমীনূর রশীদ চৌধূরী : সংগ্রাম, স্বদেশ ও সিলেট চেতনার এক অনন্য অভিযাত্রী

অপূর্ব শর্মা
ইতিহাসে কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের জীবনকে কোনো একটি পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তাঁরা একই সঙ্গে সময়ের সন্তান এবং সময় নির্মাণের কারিগর। আমীনূর রশীদ চৌধূরী ছিলেন তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তাঁকে কেবল রাজনীতিক, বিপ্লবী, সাংবাদিক, সমাজসেবক কিংবা সংগঠক বললে তাঁর বহুমাত্রিক জীবনকে সম্পূর্ণভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। তিনি ছিলেন সত্য ও ন্যায়ের প্রতি অবিচল এক সংগ্রামী মানুষ; ছিলেন স্বদেশপ্রেমী, সংস্কৃতিসচেতন, ইতিহাসানুরাগী এবং সিলেটের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক আপোষহীন কণ্ঠস্বর।
তাঁর জীবনের বিস্তৃত পরিসরে রয়েছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, বিপ্লবী রাজনীতি, কারাজীবন, ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, অসহযোগ আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। একই সঙ্গে রয়েছে সিলেটের আঞ্চলিক স্বার্থরক্ষা, ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণ, সিলেটি নাগরী লিপির প্রতি অনুরাগ, চা-শিল্পের উন্নয়ন এবং সাংবাদিকতার মাধ্যমে জনমত গঠনের নিরলস প্রয়াস। ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর সমাজ ও মানুষের জন্য কাজ করাই ছিল তাঁর জীবনের মূল দর্শন।
আমীনূর রশীদ চৌধূরীর জন্ম ১৯১৫ সালের ১৭ নভেম্বর কলকাতার ৩৮ নম্বর জাননগর রোডে। তাঁর জন্ম এমন এক ঐতিহাসিক সময়ে, যখন ভারতবর্ষজুড়ে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের নতুন নতুন অধ্যায় রচিত হচ্ছিল। যুদ্ধ, বিপ্লব ও স্বাধীনতার আকাক্সক্ষায় উত্তাল সেই সময় তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
জন্মের পরপরই মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হওয়া তাঁর জীবনের এক করুণ বাস্তবতা। মা রাজিয়া রশীদ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হলে শিশুপুত্রের সংক্রমণের আশঙ্কায় তাঁকে মায়ের কাছ থেকে দূরে রাখা হয়। পরে তিনি এক ইংরেজ দম্পতিÑচার্লস বেল ও এলিজাবেথ বেলের স্নেহে প্রতিপালিত হন। ইংরেজ পরিবেশে বেড়ে ওঠার ফলে তাঁর শৈশবের ভাষা ছিল ইংরেজি; ইংরেজি জীবনাচার, চার্চে যাওয়া এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মধ্যেই কাটে তাঁর জীবনের প্রথম অধ্যায়। কিন্তু ইতিহাসের এক বিস্ময়কর পরিহাস হলোÑইংরেজ দম্পতির স্নেহে বেড়ে ওঠা এই শিশুই পরবর্তীকালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এক দুর্দমনীয় কর্মীতে পরিণত হন। তাঁর রক্তের উত্তরাধিকার, পারিবারিক রাজনৈতিক পরিবেশ এবং স্বদেশের বাস্তবতা তাঁকে ধীরে ধীরে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করে।
আমীনূর রশীদ চৌধূরীর শিক্ষাজীবন শুরু হয় কলকাতার বয়েজ স্কুলে। পরবর্তীকালে তিনি সিলেটে এসে রাজা গিরীশচন্দ্র হাইস্কুল থেকে ১৯২৮ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর মুরারীচাঁদ কলেজে পড়াশোনা এবং পরে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। কিন্তু তাঁর জীবন কেবল পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৯২৯ সালে মহাত্মা গান্ধীর আন্দোলনে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটে। আইন অমান্য আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে তিনি গ্রেফতার হন এবং সেই সঙ্গে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনেরও সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু বিদ্যালয়ের শিক্ষা যেখানে শেষ হয়েছিল, সেখান থেকেই যেন শুরু হয়েছিল জীবনের বৃহত্তর শিক্ষার অধ্যায়-সংগ্রামের শিক্ষা, মানুষের জন্য আত্মত্যাগের শিক্ষা এবং স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গের শিক্ষা।
পারিবারিক পরিবেশ আমীনূর রশীদ চৌধূরীর রাজনৈতিক চেতনা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাঁর পিতা আবদুর রশীদ চৌধূরী সরকারি চাকরিজীবী হলেও ব্রিটিশ শাসনের প্রতি তাঁর গভীর বিরাগ ছিল। তাঁদের বাড়ি ‘রশীদ মঞ্জিল’ ছিল বহু ব্রিটিশবিরোধী নেতা ও বিপ্লবীর মিলনস্থল। ফলে শৈশব থেকেই আমীনূর রশীদ এমন এক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন, যেখানে স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিল পারিবারিক আলোচনার অংশ।
বিপ্লবী অমূল্য ঘোষের সংস্পর্শ তাঁর জীবনকে আরও দৃঢ়ভাবে বিপ্লবী আন্দোলনের দিকে নিয়ে যায়। সহিংস ও অহিংসÑউভয় ধারার আন্দোলনের সঙ্গেই তিনি যুক্ত ছিলেন। সিলেটের বিভিন্ন গোপন রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রমে অংশগ্রহণের পাশাপাশি তিনি বিপ্লবীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ধীরে ধীরে তিনি গোপন বিপ্লবী সংগঠনের একজন বিশ্বস্ত কর্মীতে পরিণত হন। এই সময় তাঁর দায়িত্বের পরিধি এতটাই বৃদ্ধি পায় যে বিপ্লবী দলের অস্ত্রভা-ার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও তাঁর ওপর অর্পিত হয়। বিপ্লবী কর্মকা-ের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা ছিল নিছক আবেগের নয়; ছিল দায়িত্ব, বিশ্বাস এবং আত্মত্যাগের।
মাত্র তেরো বছর বয়সেই আমীনূর রশীদ চৌধূরী কারাজীবনের অভিজ্ঞতা লাভ করেন। যে বয়সে একজন কিশোরের স্কুলের মাঠে সময় কাটানোর কথা, সেই বয়সে তাঁকে দেখতে হয়েছে কারাগারের অন্ধকার।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তাঁকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়। ১৯৩২ সালে সিলেটের গোবিন্দচরণ পার্কে আইন অমান্য করে বক্তৃতা দেওয়ার অভিযোগে তাঁর দেড় বছরের কারাদ- হয়। পুলিশের নির্যাতনও তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে নির্মমভাবে। কিন্তু জেল, জুলুম কিংবা শারীরিক নির্যাতন তাঁর বিশ্বাসকে ভেঙে দিতে পারেনি। বরং প্রতিটি কারাবাস যেন তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে।
তাঁর জীবনের এই অধ্যায় প্রমাণ করেÑআমীনূর রশীদ চৌধূরীর কাছে স্বাধীনতা ছিল কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়; ছিল ব্যক্তিগত জীবনের চেয়েও বড় এক আদর্শ।
আমীনূর রশীদ চৌধূরীর রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মহাত্মা গান্ধী ও নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর সান্নিধ্য লাভ। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের দুই ভিন্নধর্মী কিন্তু মহৎ নেতার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ব্যাপ্তিকে আরও তাৎপর্যময় করে তোলে।
গান্ধীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ এবং রাজনৈতিক আলাপের স্মৃতি যেমন তাঁর চিন্তার পরিসরকে প্রকাশ করে, তেমনি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর প্রতি তাঁর গভীর আস্থা ও সম্পর্ক তাঁকে সশস্ত্র সংগ্রামের ধারার সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করে। তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং নেতাজীর বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও ভূমিকা রাখেন।
নেতাজীর সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাতের সময় যে উৎসাহব্যঞ্জক কথাগুলো তিনি পেয়েছিলেনÑদেশের কাজে লাগার আহ্বানÑতা তাঁর বিপ্লবী জীবনের এক বিশেষ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আমীনূর রশীদ চৌধূরীর সংগ্রাম কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নেও তিনি ছিলেন সচেতন ও সক্রিয়। ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় তিনি বাংলার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। সিলেটের সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিন যে দ্বিধা ও বিভ্রান্তি ছিল, তার বিরুদ্ধে বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৩৬ সালে মুসলিম সাহিত্য সংসদ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। সিলেটের মুসলিম সমাজের সাংস্কৃতিক বিকাশে তাঁর মতো সংস্কৃতিমনা মানুষের প্রয়োজনীয়তার কথা সমকালীন বিশিষ্টজনরাও স্বীকার করেছেন। ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল মূলত আত্মপরিচয়ের পক্ষেÑনিজস্ব শিকড়, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধারণ করার পক্ষে।
আমীনূর রশীদ চৌধূরীর দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় নিঃসন্দেহে মহান মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের অসহযোগ আন্দোলনের সময় তিনি ছিলেন একজন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক পরামর্শদাতা ও নীতিনির্ধারক। ১৯৭১ সালের মার্চে দেশের পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তিনি সিলেটে স্বাধীনতার আন্দোলন সংগঠিত করতে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি ‘যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার’ আহ্বানসংবলিত বিপুলসংখ্যক পোস্টার মুদ্রণ করে বিভিন্ন স্থানে বিতরণের ব্যবস্থা করেন। যুগভেরী পত্রিকাও এই সময় স্বাধীনতার দাবিতে সাহসী ভূমিকা পালন করে। ২৪ মার্চ প্রকাশিত পত্রিকার প্রথম পাতায় ‘স্বাধীন বাংলাদেশ চাই’ শিরোনাম প্রকাশের সিদ্ধান্ত ছিল সেই সাহসী রাজনৈতিক অবস্থানেরই প্রতীক।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি শুধু প্রচারণার কাজেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ সংগ্রহ, যানবাহন, কাপড় ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ এবং সীমান্ত অতিক্রমকারী মানুষের সহায়তায় তিনি সক্রিয় ছিলেন। নিজের জীবনকে বিপন্ন করে তিনি সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
অবশেষে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তিনি আটক হন। তাঁকে সিলেটের সালুটিকর মডেল হাইস্কুলের নির্যাতনকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় একশ ত্রিশ দিন ধরে অমানুষিক নির্যাতনের মধ্যেও তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি।
শারীরিকভাবে তাঁকে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু তাঁর বিশ্বাসকে ভাঙা যায়নি। এখানেই একজন বিপ্লবীর জীবনের সর্বোচ্চ পরীক্ষা-যন্ত্রণার মুখেও নীরব থাকা, মৃত্যুর আশঙ্কার মধ্যেও আদর্শকে অক্ষুন্ন রাখা।
ইউরোপীয় বন্ধুদের প্রচেষ্টা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সুবাদে তিনি পাকিস্তানি বন্দিদশা থেকে মুক্তি পান। তবে মুক্তি পেলেও তাঁর ওপর নজরদারি ও গৃহবন্দিত্ব অব্যাহত ছিল। নানা নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে তিনি স্ত্রী ও কন্যাসহ দেশত্যাগে সক্ষম হন।
জেনেভায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর তিনি লন্ডনে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠন ও প্রবাসী বাঙালিদের সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। অস্থায়ী বাংলাদেশ মিশনের কার্যক্রম, অর্থ সংগ্রহ এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন সৃষ্টিতে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
আমীনূর রশীদ চৌধূরীর জীবনকে বোঝার জন্য তাঁর সিলেটচেতনার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আঞ্চলিক ন্যায়বিচারের কোনো বিরোধ নেই। বরং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য প্রতিটি অঞ্চলের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। সিলেটের স্বার্থরক্ষার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপোষহীন। তাঁর চিন্তা, লেখালেখি ও আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র ছিল সিলেটের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন। তিনি প্রথমদিকে সিলেটকে পৃথক প্রদেশ করার দাবি উত্থাপন করেন। পরবর্তীকালে এই দাবিই বিভাগ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়।
সাপ্তাহিক যুগভেরীর মাধ্যমে তিনি ধারাবাহিকভাবে সিলেটের দাবি তুলে ধরেন, জনমত গঠন করেন এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সক্রিয় করেন। ১৯৯৫ সালে সিলেট বিভাগ প্রতিষ্ঠার যে ঐতিহাসিক অর্জন, তার দীর্ঘ আন্দোলনের প্রাথমিক ভিত্তি নির্মাণে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই তাঁকে ‘সিলেটবন্ধু’ বলা হয়।
আমীনূর রশীদ চৌধূরীর আরেকটি অসাধারণ পরিচয়-তিনি ছিলেন ইতিহাস ও প্রতœঐতিহ্যের একনিষ্ঠ অনুরাগী। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য তার অতীতকে সংরক্ষণ করা অপরিহার্য। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি দুর্লভ প্রতœনিদর্শন, তাম্রলিপি, প্রাচীন পুঁথি ও ঐতিহাসিক দলিল সংগ্রহে মনোনিবেশ করেন।
বাংলার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল ‘পশ্চিমভাগ তাম্রশাসন’ এবং ‘কালাপুর তাম্রফলক’ উদ্ধারে তাঁর ভূমিকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শুধু প্রতœবস্তু সংগ্রহ করাই নয়, সেগুলোর পাঠোদ্ধার ও গবেষণার ব্যবস্থাও করেছিলেন তিনি। সিলেটি নাগরী লিপি সংরক্ষণ ও গবেষণার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল স্মরণীয়। কালের গহ্বরে হারিয়ে যেতে বসা প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহ করে গবেষকদের হাতে তুলে দেওয়া ছিল তাঁর ইতিহাসসচেতনতার বাস্তব প্রকাশ। তাঁর কাছে ইতিহাস অতীতের মৃত স্মৃতি ছিলো না; ছিলো জাতির আত্মপরিচয়ের জীবন্ত ভিত্তি।
সিলেটের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি চা-শিল্প। এই শিল্পের সংকটকালেও আমীনূর রশীদ চৌধূরী দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন। বিশেষত ক্ষুদ্র চা-বাগান রক্ষা এবং চা-শিল্পের স্বার্থ সংরক্ষণে তাঁর উদ্যোগ ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
চা-শিল্পের দুর্দিনে তিনি মালিক ও সংশ্লিষ্টদের সংগঠিত করেন এবং শিল্প রক্ষায় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। শ্রমিকদের স্বার্থ নিয়েও তিনি ছিলেন সচেতন। অর্থনৈতিক উন্নয়নকে তিনি কেবল ব্যবসায়িক লাভের দৃষ্টিতে দেখেননি; বরং আঞ্চলিক উন্নয়ন ও মানুষের জীবনমানের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছেন।
আমীনূর রশীদ চৌধূরীর জীবন এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাঁর জীবনপথে রয়েছে বিপ্লব, কারাজীবন, নির্যাতন, মুক্তিযুদ্ধ, সাংবাদিকতা, সংস্কৃতি, ইতিহাসচর্চা এবং আঞ্চলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।
তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়ে আদর্শকে বড় মনে করেছেন; ক্ষমতার চেয়ে সত্যকে এবং ব্যক্তিগত প্রাপ্তির চেয়ে মানুষের কল্যাণকে প্রাধান্য দিয়েছেন। জেল, জুলুম, নির্যাতন কিংবা মৃত্যুভয়- কোনোটিই তাঁকে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
আজকের সময়ে আমীনূর রশীদ চৌধূরীকে স্মরণ করা কেবল একজন অতীতপুরুষকে শ্রদ্ধা জানানো নয়। তাঁকে স্মরণ করা মানে সত্যের প্রতি অবিচল থাকা, ইতিহাসকে সংরক্ষণ করা, সংস্কৃতির শিকড়কে ধারণ করা এবং নিজের অঞ্চল ও দেশের ন্যায্য অধিকারের প্রশ্নে সোচ্চার হওয়ার শিক্ষা গ্রহণ করা।
সমাজ সবসময় গুণী মানুষের যথাযথ মূল্যায়ন করে না। কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তার আপন নিয়মেই মানুষের অবদানকে চিহ্নিত করে। আমীনূর রশীদ চৌধূরী সেই ইতিহাসেরই এক উজ্জ্বল নাম-একজন কর্মবীর, একজন সংগ্রামী, একজন ইতিহাসসচেতন মানুষ এবং সর্বোপরি একজন অনন্য দেশপ্রেমিক।