সুবর্ণা হামিদঃ
মানুষের পরিচয় কি শুধু তাঁর পেশায়, নাকি তাঁর চিন্তা, সৃজনশীলতা ও কর্মের বিস্তৃত পরিসরে? ড. এম শহীদুল ইসলাম শহীদের জীবন সেই প্রশ্নের সামনে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করে। পেশায় আইনজীবী, দায়িত্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ কিন্তু তাঁর আগ্রহ ও কর্মপরিধি ছড়িয়ে রয়েছে সাহিত্য, গবেষণা, সংস্কৃতি ও সংগীতের নানা শাখায়। আইনের জটিল বিষয় নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি তিনি লেখেন কবিতা, রচনা করেন গান, সুর সৃষ্টি করেন এবং নিজের সৃষ্টিতে কণ্ঠও দেন। এক জীবনে এতগুলো ভিন্ন ধারার চর্চা তাঁকে দিয়েছে বহুমাত্রিক পরিচয়।
ড. এম শহীদুল ইসলাম শহীদের কর্মজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, প্রতিষ্ঠিত পেশাগত অবস্থানের মধ্যেও নতুন কিছু শেখার আগ্রহ ধরে রাখা। ২০২০ সালে করোনাকালে গান লেখা শুরু করেন তিনি। প্রিয় ছাত্র অমিতাভ চক্রবর্তী রনির গান রচনার আগ্রহ তাঁকে এ ক্ষেত্রে অনুপ্রাণিত করে। ছাত্রের সৃজনশীলতা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে নিজেও গান লেখার চর্চা শুরু করেন। প্রথমে গানবিষয়ক বই পড়েন, বিভিন্ন শিল্পী ও গীতিকারের পরামর্শ নেন এবং নিয়মিত লেখার অনুশীলন করেন। ধীরে ধীরে তাঁর লেখা গানের সংখ্যা প্রায় একশতে পৌঁছায়। গান লিখতে লিখতেই নিজের মধ্যে সুর সৃষ্টির আগ্রহ খুঁজে পান। পরবর্তী সময়ে নিজের লেখা প্রায় ২০টি গানে সুরারোপ ও কণ্ঠ দেন। তাঁর প্রকাশিত দুটি গানের বই ‘যেতে হয় এক রঙ্গে’ ও ‘জন্মিলে মরিতে হয়’।
সংগীতের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চায়ও রয়েছে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা। লেখক, গবেষক, কলামিস্ট, কবি ও রবীন্দ্র গবেষক হিসেবে তিনি কাজ করছেন বিভিন্ন বিষয়ে। আইনসহ নানা বিষয়ে তাঁর লেখা, সম্পাদনা ও প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৬০। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কলাম লিখে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নানা বিষয়ে মতামত তুলে ধরেছেন। তাঁর লেখালেখির সঙ্গে সামাজিক আন্দোলন ও বিভিন্ন দাবি আদায়ের বিষয়ও যুক্ত রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা এবং তথ্য-উপকরণ সংগ্রহের কাজেও তিনি সম্পৃক্ত।
১৯৭২ সালের ১৬ জুন হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার আজিমনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ড. এম শহীদুল ইসলাম শহীদ। শিক্ষাজীবনে তিনি এমএসসি, এলএলএম, পিজিডি ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি সিলেট মেট্রোপলিটন ল’ কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি সিলেট জজ কোর্টে সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে আইন পেশায় নিয়োজিত আছেন। তাঁর স্ত্রী রাহিমা সুলতানা মনি সরকারি চাকরিজীবী। তাঁদের একমাত্র সন্তান আবরার ফাইয়াজ বন্ধন একজন চিকিৎসক।
পেশাগত দায়িত্বের বাইরেও সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে রয়েছে তাঁর সম্পৃক্ততা। তিনি একজন রোটারিয়ান, পুঁথিপাঠক, দক্ষ সংগঠক ও মানবাধিকারকর্মী। অত্যাচারিত ও নির্যাতিত মানুষের আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাঁদের কল্যাণে কাজ করার প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি নিজের কর্মপরিধিকে আরও বিস্তৃত করেছেন।
ব্যক্তিজীবনে নম্রতা, ভদ্রতা ও বিনয়ী আচরণের জন্য পরিচিত ড. এম শহীদুল ইসলাম শহীদ। বহুমুখী দায়িত্বের মধ্যেও জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীল কাজের প্রতি তাঁর আগ্রহ অব্যাহত রয়েছে। নিজের কর্মময় জীবনের জন্য মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর কাছে সৃজনশীলতার চর্চা শুধু নতুন কিছু তৈরি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নিজের চিন্তা, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ারও একটি মাধ্যম।
আইন, শিক্ষা, সাহিত্য, গবেষণা ও সংগীত—প্রতিটি ক্ষেত্রের কাজের ধরন আলাদা হলেও ড. এম শহীদুল ইসলাম শহীদের জীবনে এগুলো এসে মিলেছে জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতার এক অভিন্ন ধারায়। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নতুন কিছু শেখা এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করার যে আগ্রহ তিনি ধরে রেখেছেন, সেটিই তাঁর বহুমাত্রিক জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।