অনলাইনে অশ্লীল-মানহীন ওয়েব সিরিজ ও ভিডিওর ছড়াছড়ি

প্রকাশিত: ৬:৪৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৯, ২০১৮

ডেস্করিপোর্ট:
ইদানীং অনলাইনে চলছে মানহীনতা ও অশ্লীলতায় ভরপুর মিউজিক ভিডিও এবং রসালো ওয়েব সিরিজের রমরমা আয়োজন। দেশীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ভুলে গিয়ে নিম্নমানের নির্মাতারা ভিউ ও আর্থিক লাভের আশায় তৈরি করছেন সুড়সুড়ি দেওয়া কনটেন্ট। মুক্তিপ্রাপ্ত বেশ কিছু ছবির আইটেম গানেও দেখা যায় অশ্লীলতা। গানের কথা যেমন অরুচিকর ও অশ্লীল তেমনি এর ভিডিও। এ মাধ্যমে সেন্সর বলতে আপাতত কোনো কিছুই বাংলাদেশে নেই। ওয়েব সিরিজের নামে যে যার মতো করে কনটেন্ট বানিয়ে ইউটিউবে ছড়িয়ে দিচ্ছে। গত রোজার ঈদে প্রথমবারের মতো যুক্ত হয় টিভি অনলাইন। টিভির পাশাপাশি ওই সময় ইউটিউব চ্যানেলে একাধিক ধারাবাহিক নাটক প্রকাশ পায়। কারণ ভিউয়ারই হয়ে গেছে জনপ্রিয়তার মাপকাঠি। অন্যদিকে গান এখন পুরোদস্তুর ইউটিউবনির্ভর। বিষয়বস্তু নির্বাচন ও প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা, তরুণ জনপ্রিয় নির্মাতা, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সংযুক্তি; ওয়েব সিরিজের সম্ভাবনাকে বেশ ভালোভাবে জাগিয়ে তুলেছে। কিন্তু অবাধ স্বাধীনতার নামে রসালো কনটেন্ট অবশ্যই কারও কাম্য নয়! জনপ্রিয়তার আশায় নির্মিত এসবে যুক্ত হয়েছে যৌনতা, অশ্লীলতা। প্রচারিত ‘দ্য লিস্ট’, ‘হেলেন অব ট্রয়’, ‘বাঘবন্দি’ ‘পালাবি কোথায়’, ‘আবসিক হোটেল’ প্রভৃতি ওয়েব সিরিজে অপ্রাসঙ্গিক ও অহেতুক যৌনতার সুড়সুড়ি, অশালীন সংলাপ ও অঙ্গভঙ্গি, মাদক গ্রহণের দৃশ্যবালির কারণেই মূলত এই সমালোচনা। বর্তমানে এই মাধ্যমকে পুঁজি করে অনন্য মামুন নির্মাণ করেছেন ‘ফোন এক্স’ নামে ওয়েব সিরিজ। তবে সমালোচিত ও বিতর্কিত হলেও অনেকেই বলছেন, আগামী দিনে ‘ওয়েব সিরিজ’ হতে যাচ্ছে বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। তবে এ নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন বলিউড অভিনেতা ইরফান খান। তার মতে, ‘আমাদের কাছে ওয়েব সিরিজ করার মতো প্রতিভা নেই। এটিই সত্য।’ এদিকে টিভির দর্শক চলে গেছে ইউটিউবে। এই সুযোগে অনেক নির্মাতা ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান শুধু ইউটিউবের জন্য করছেন ওয়েব সিরিজ। কিন্তু এসব ওয়েব সিরিজে কি দেখানো হচ্ছে? সাধারণ মানুষকে দেওয়া হচ্ছে সুড়সুড়ি। অন্যদিকে ইউটিউবে গান প্রকাশের বিষয়টি উন্মুক্ত থাকায় এর ফায়দা নিচ্ছে অশুভ মহল। অশ্লীল মিউজিক ভিডিও বানিয়ে তার মাধ্যমে ইউটিউব থেকে আয়ের চেষ্টা করছে তারা। গান প্রকাশ করছে অখ্যাত সব চ্যানেল। মিউজিক ভিডিওতে দেখা যায় অযথা শরীর প্রদর্শনের হিড়িক।

আবুল হায়াত (নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পী)

টেকনোলজি নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। এটা যুগের চাহিদা। তবে টেকনোলজিকে নেতিবাচক ব্যবহার করায় আমার ঘোর আপত্তি রয়েছে। ভালো ওয়েব কনটেন্ট হলে আমার আপত্তি থাকার কথা নয়। কনটেন্ট হতে হবে মানসম্পন্ন, রুচিশীল। অনেক সময় চ্যানেলেও কুরুচিকর কনটেন্ট চালানো হচ্ছে- এটাও আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যায় না। এসব অশ্লীল ও কুরুচিকর জিনিস বানানো হচ্ছে মিডিয়ার প্রতি আকর্ষণ আর লোভে। বিবেক দ্বারা তাড়িত হলে কিন্তু কোনো অভিনয়শিল্পীই এসবে অভিনয় করবেন না। মনে করি, সিনেমার মতো অনলাইনেও সেন্সরশিপ থাকাটা জরুরি।

গাজী রাকায়েত (নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পী)

এটি নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য একটি অশনিসংকেত। কন্ট্রোল করতে না পারলে যা-তা ব্যাপার হয়ে যেতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়াও তো এখন অনিয়ন্ত্রিত! স্বাধীনভাবে কোনো কিছু প্রকাশ করার অধিকার সবারই আছে কিন্তু স্বাধীনতার নামে অশ্লীলতা, কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট ছড়িয়ে দিতে পারি না। আমার মতে এ ব্যাপারে প্রতিটি থানায় সাইবার ক্রাইম ইউনিট থাকা উচিত। তারানা হালিমও এই ব্যাপারে কিছু উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু এই মুভমেন্ট এখনো কেন সচল হচ্ছে না?

গিয়াস উদ্দিন সেলিম (নির্মাতা)

আমি টেকনোলজি কম বুঝি। তবে যেহেতু এখন ওপেন প্লাটফর্ম রয়েছে, তাই যে কেউ চাইলেই নিজের কনটেন্ট প্রকাশ করতে পারে। তবে আর্টিস্টিক কিছু বানিয়ে সেটা প্রকাশ করলে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু মানহীন, কুরুচিপূর্ণ কোনো কিছুই কাম্য নয়। আমি অনলাইন নিয়ন্ত্রণের কথা বলব না কিন্তু যারা করছে, কেন করছে এটা তাদের জানা জরুরি। সেন্সরশিপের নামে সবই বন্ধ করা যাবে না। স্বাধীনতা থাকতে হবেই, তবে দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে।

মাবরুর রশীদ বান্নাহ (নাট্যনির্মাতা)

আমি এই সময় অনেক ইউটিউব ফিকশন বানিয়েছি। কই আমার তো এসব কনটেন্ট হিট করানোর জন্য কোনো অশ্লীল বা কুরুচিকর দৃশ্যায়নের প্রয়োজন পড়েনি! স্বাধীন অনলাইন মাধ্যম হলেই কি যে কেউ জনপ্রিয়তার জন্য সুড়সুড়ি দেওয়া এডাল্ট কনটেন্ট বানাবেন? আমি কখনোই ভিউ বাড়ানোর জন্য এসব করিনি। বাকি অনেকেই এডাল্ট বা রসালো জিনিস বানিয়েছে। তারা ভেবেছিল, এডাল্ট বিষয়কে যুক্ত করতে পারলেই সেটি হিট হবে- এটা একদমই ভুল। এরা বেশিদিন টিকবে না! কারণ, এসব বিষয় আমাদের সোসাইটির সঙ্গে যায় না। শুরুর দিকে ওয়েব সিরিজে নোংরামি বেড়ে গিয়েছিল, এখন কমছে। তবে দেখবেন এইসব কিছুই থাকবে না; বন্ধ হয়ে যাবে।

সুত্র-বাংলাদেশ প্রতিদিন