বৃদ্ধাশ্রম নয় নিজ আবাসস্থলই হোক মা-বাবার শেষ আশ্রয়স্থল

প্রকাশিত: ২:৪২ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২৭, ২০২০

স্টাফ রিপোর্টার :::
বৃদ্ধাশ্রম মানে বৃদ্ধদের আশ্রয়স্থল। বর্তমান সময়ের দিকে লক্ষ্য করে বললে, বলতে হবে- বৃদ্ধ পিতা-মাতার জন্য পরিবার ও স্বজনদের থেকে আলাদা আবাস বা আশ্রয়ের নাম বৃদ্ধাশ্রম। মূলত অসহায় ও গরীব বৃদ্ধদের প্রতি করুণার বোধ থেকেই হয়ত বৃদ্ধাশ্রমের সৃষ্টি- যেখানে বৃদ্ধদের প্রয়োজনীয় সেবা ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু বৃদ্ধাশ্রমের সেই ছবি এখন আর নেই। এখন যা আছে তা হল, ছোট বেলায় যে বাবা-মা ছিলেন আমাদের সবচে’ বেশি আপন, যাদের ছাড়া আমরা কিছুই করতে পারতাম না, যারা নিজেদের আরাম হারাম করে আমাদের মানুষ করেছেন নিজের সব দুঃখ কষ্ট বুকে চেপে আমার হাসি মাখা মুখ দেখার জন্য যে মা ব্যকুল থাকতেন, আমি না খেলে যিনি খেতেন না, আমি না ঘুমালে যিনি ঘুমাতেন না, অসুস্থ হলে যিনি ঠায় বসে থাকতেন আমার শিয়রে, যে বাবা-মা তিলে তিলে নিজেদের সবকিছু বিসর্জন দিয়েছেন আমাকে মানুষ করার জন্য, সেই বাবা-মায়ের শেষ বয়সের ঠিকানা এখনকার বৃদ্ধাশ্রমগুলো। মানবতার প্রতি এ এক চরম উপহাস।
এক-দু’ দশক আগেও আমাদের দেশে বৃদ্ধাশ্রম তেমন একটা ছিল না। সময়ের সাথে সাথে এর সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু কেন এই বৃদ্ধাশ্রম?
এ প্রশ্নের উত্তর বড়ই করুণ। যে সন্তান বাবা-মাকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারত না, মা-বাবাই ছিল যার সারা জীবনের আশ্রয়স্থল, সে কিনা আজ বাবা-মাকে নিজের কাছে রাখার প্রয়োজন বোধ করছে না, বাবা-মাকে ঝামেলা মনে করছে। তাঁদেরকে রেখে আসছে বৃদ্ধাশ্রমে। অথবা অবহেলা ও দুর্ব্যবহার করে এমন অবস্থার সৃষ্টি করছে যেন তারা নিজেরাই ভিন্ন কোনো ঠাঁই খুঁজে নেন। অনেকের ভাব এমন, টাকা পয়সার অভাব না থাকলেও বাবা-মাকে দেওয়ার মত সময়ের তাদের অভাব আছে। তাদের সঙ্গে কথা বলার মতো পর্যাপ্ত সময় তাদের নেই। তাই বাবা-মা একা নির্জনে থাকার চেয়ে বৃদ্ধাশ্রমে অন্যদের সঙ্গে কাটানোই নাকি ভালো মনে হয়।
এ ধরনের নানা অজুহাতে বাবা-মাকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। একসময় যারা নামী দামী বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষক ও চাকরিজীবী ছিলেন, বর্ণাঢ্য ছিল যাদের জীবন, বৃদ্ধ বয়সে এসে নিজ সন্তানদের অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হয়ে বহু পিতা-মাতা এখন বৃদ্ধাশ্রমের স্থায়ী বাসিন্দা হতে বাধ্য হচ্ছেন। পরিবার ও সন্তান থেকেও ‘সন্তানহারা এতীম’ হয়ে জীবন যাপন করছেন। এরচে’ বড় দুঃখ মা-বাবার জীবনে আর কিছুই হতে পারে না। পত্রিকার পাতায় নজর বুলালেই এর প্রমাণ মেলে। বিভিন্ন সময়ই বৃদ্ধাশ্রম থেকে সন্তানের কাছে লেখা বৃদ্ধ পিতা-মাতার চিঠি পত্রিকায় ছাপা হয়। যা পড়ে চোখের পানি সংবরণ করা যায় না।
আমরা যারা বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে অবহেলা করছি, তাদেরকে বোঝা মনে করছি, বৃদ্ধাশ্রমে তাদেরকে ফেলে রেখেছি, তারা কি কখনো ভেবে দেখেছি- আজ তারা বৃদ্ধ। তারা তো বৃদ্ধ হয়ে পৃথিবীতে আসেননি। তারা তো পরিবারের বোঝা ছিলেন না। বরং আমরা সন্তানরাই তো তাদের ‘বোঝা’ ছিলাম। তারা তো কখনো আমাদেরকে বোঝা মনে করেননি। আমাদেরকে বড় করে তোলার জন্য তারা বিন্দু পরিমাণ কমতি করেননি। কত যতœ করে বুকে আগলিয়ে আমাদের লালন-পালন করেছেন ।
মা আমাদের জন্য কতই না কষ্ট করেছেন। গর্ভধারণের কষ্ট। প্রসবের কষ্ট। স্তন্যদানের কষ্ট। রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটিয়ে দেয়ার কষ্ট। এ তো প্রাথমিক কষ্ট। এরপর প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত মা আমাদের জন্য কত যে কষ্ট করেছেন, এর কোনো হিসেব নেই। পৃথিবীতে এমন মা নেই যার এ কষ্টগুলো হয় না
তাছাড়া বাংলাদেশের পত্র পত্রিকা গুলোতে বিভিন্ন সময়ে বৃদ্ধাশ্রমগুলোর পরিবেশ, অনিয়ম-দুর্নীতির খবর আমরা দেখতে পাই। প্রায়ই এই অনিয়ম দুর্নীতির খবর বিভিন্ন নিউজ চ্যানেলে পত্র-পত্রিকায় আমরা দেখা যায়। বিশেষ করে বৃদ্ধাশ্রম গুলোর খাবার-দাবারের মান, টয়লেট ব্যবস্থা এগুলো নিয়েই বেশি অভিযোগ।
সিলেটের বৃদ্ধাশ্রমের অবস্থাই ধরা যাক না কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী সাথে আমাদের কথা হয় তারা অভিযোগ করেন, সিলেটের বৃদ্ধাশ্রমে আসন সংখ্যা খুবই কম আর যতটুকু আসন আছে সেগুলো বেশির ভাগ সময় সীট খালি পাওয়া যায় না, যদিও পাওয়া যায় বেড বিছানার মান নিয়েও রয়েছে অনেক প্রশ্ন। তাছাড়া বৃদ্ধাশ্রম এর সার্বিক দিক বিশেষ করে টয়লেট সুবিধা ও খাবারের মান অত্যন্ত নি¤œমানের। টাকা পয়সা দিয়েও খাবার-দাবার বা অন্যান্য কোন সুবিধা এখানে ভালো করে পাওয়া যায় না। তাছাড়া ফ্যান লাইটগুলো নিয়ে আছে অনেক অভিযোগ। গরমের সময় ফ্যান থাকেনা এবং শীতের সময়ে তারা নানান কষ্টে দিনযাপন করেন। সার্বিক দিক বিবেচনা করলে দেখা যায় বাংলাদেশের প্রায় সকল বৃদ্ধাশ্রমের একই অবস্থা। এজন্য বৃদ্ধাশ্রম গুলিতে বৃদ্ধ মানুষগুলো অনেক কষ্টে দিনযাপন করছেন।
বাংলাদেশে ষাটোর্ধ্ব বয়সীদের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার হার ৫০ ভাগ। আর এ ভাইরাসে দেশে সংক্রমণের পরবর্তী হটস্পট হতে পারে বৃদ্ধাশ্রমগুলো। দেশে করোনায় ষাটোর্ধ্বদের আক্রান্তের হার তুলনামূলকভাবে কম। তবে বয়সজনিত বা অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা থাকার কারণে এই গ্রুপে মৃত্যুর হার বেশি। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। আমরাও একসময় শিশু ছিলাম। আমরা তো কখনো তাদের কাছে বোঝা হয়ে ছিলাম না। বৃদ্ধ বয়সেও মা-বাবা শিশুদের মতো হয়ে যান। শিশুসুলভ আচরণ করেন। তারা যেমন করে আমাদের শৈশব থেকে শুরু করে শতকোটি ত্যাগ-তিতিক্ষা স্বীকার করে আমাদের মানুষ করেছেন। আমাদেরও কতর্ব্য সেই মানুষগুলোকে জীবনের শেষ সময়টুকুতে বৃদ্ধাশ্রম নামক কারাগারে না রেখে নিজের কাছেই রাখা।
মনে রাখা সমীচিন যে, আমরাও একদিন বৃদ্ধ হব। আমরা যদি আমাদের বৃদ্ধ বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসি। আমাদের সন্তানরাও হয়তো একদিন আমাদেরকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসবে। সুতরাং, আমাদের উচিত বৃদ্ধ বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রম নয়, কাছে রাখা, ভালোবাসা, আমাদের শৈশবে তারা যেমনটি করেছিলেন। অতএব, বৃদ্ধাশ্রম নয় নিজ আবাসস্থলই হোক মা-বাবার শেষ আশ্রয়স্থল।